এক.
বাসি ছাইয়ের গন্ধ ছড়ানো ফায়ার প্লেসের সামনে বসে থাকি সারা দিনমান। সম্মোহন চক্রের কেন্দ্রবর্তী রঙধনুর বর্ণিল আভায় বিধূর বিন্দুটিতে কনসেনট্রেট করি, কিন্তু প্রগাঢ় হয় না প্রার্থিত ধ্যান। নির্জনতা খারাপ লাগে না, সহনীয় হয়ে ওঠে অপ্রাপ্তি, কাঙ্ক্ষিত হয় অপ্রেম, কেটে যায় বিচ্ছিন্নতার শুভ্র পিরহানে চারকোল চূর্ণে কালিমা-লিপ্ত হওয়ার ভয়—ভাবি, এ অপরাহ্ণে লগকেবিনের বাইরে গেলে কেমন হয়।
দুই.
দরোজায় মরচে পড়া ছিটকিনিটি ক্যাচমেচিয়ে খুলতেই—ছিঁড়েখুঁড়ে ছত্রখান হয় মাকড়শার জাল, ব্রেকাপের কথা ফিরে আসে মনে, উপহারের রুপালি চেন থেকে ঠিক এ রকম ছিঁড়ে পড়ে ছিল ভালোবাসার প্রবাল। বাতাসে জলকণার নোনা গন্ধ, দুয়ার আটকাতে গিয়ে মনে পড়ে, ঠিক এভাবে হৃদয়ের কপাট হয়েছিল বন্ধ। সূর্যের ম্রিয়মাণ স্রোতে বিকেল ভেসে যাচ্ছে ভাটিতে, জাঁকিয়ে পড়েছে কুয়াশার গিলাফমোড়া শীত, এ বেলা প্রয়োজন খানিক উষ্ণতা, আপাতত তফাত যাক অতীত।
তিন.
গ্যারাজে ত্রিপলের তলায় ডাঁই করে রাখা আছে শুকনো খটখটে ফায়ার-উড। টেনে-হিঁচড়ে চুল্লির জন্য সংগ্রহ করতে চাই সামান্য কাঠ, কোথায় কী যেন ভুল হয়ে যায়, যা কিছু করতে যাই আমি, যত যত্নে বাঁধি আঁটঘাট, কোনো কিছুই করতে পারি না সুসারে সম্পন্ন, ক্ষুধার্ত হই যখন জোটাতেও পারি না অন্ন। যাক এসব বাখানি— সরাতে যাই লাকড়ি, আলগা হয়ে আসা বাকলের টুকরা-টাকরার সাথে শুকনো ঘাসপাতা মিশিয়ে তৈরি হয়েছে নীড় , মা-ইঁদুরটি তাকায় চুনি-রক্তিম চোখে, তুরতুরিয়ে ছুটে যায় দুটি শিশু, একটি ছানা থেঁতলানো পায়ে ধুকে। আমার সঞ্চালনে যে আমি বিব্রত হই বারবার, তা কি কখনো জানতে পারবে ডোরাকাটা মাকড়শা কিংবা ইঁদুরের পরিবার?
চার.
সঞ্জিবনীর শুভ্র নির্যাসে ভরে ওঠা ওলানের ভারে ভারাক্রান্ত গাভী—দোহানোর অপেক্ষায় অনুযোগে হয় অধীর, উত্তুরে হাওয়া উত্তাপরিক্ত হয়ে আছে আসন্ন শীতের শপথে, এসে দাঁড়িয়েছি এ মহূর্তে মেঠোপথে, ঝুঁটি উঁচানো জোড়া পঙ্কী মৃদু দ্বন্ধে হয়েছে অস্থির। দুটি দূরবর্তী শাখা নীরবে সংযুক্ত হয়েছে উঠেছে মাকড়শা নিঃসৃত সরু সুতলির বয়নে, রোপওয়াকের দক্ষতার পাড়ি দিচ্ছে শিশু-পতঙ্গ, স্বপ্ন তিরোহিত হয়েছে হালফিল নিবিড় শয়নে, ম্যাপোলের বর্ণালী পত্রপল্লবে তৈরি হয়েছে দৃশ্যের সুসমন্বিত ভোজ, ভারাক্রান্ত পয়স্বিনীর প্রবল অভিযোগে ছড়ায় হাহাকার, কেন জানি বাছুরটি এ বেলা হয়েছে নিখোঁজ।
পাঁচ
পাড়ার বিস্মৃতিপ্রবণ বৃদ্ধ মেঠোপথের ভেতর দিয়ে লাঠি ঠুকে ঠুকে খুঁজে নেন— দীর্ঘদিনের চেনা ট্রেইল। শুনেছি ডাইমেনশিয়াগ্রস্ত এ মানুষটির দৃষ্টিশক্তি ক্রমান্বয়ে হচ্ছে অস্তমিত, আজকাল নাকি অনুশীলন করছেন ব্রেইল। দমকা হাওয়ায় নীড় থেকে পড়ে যাওয়া চড়ুই-শাবক ডানা ঝটপটিয়ে যায় সরে, আর তো কাউকে দেখি না আজ অপরাহ্ণের এ বিষণ্ন প্রহরে। আনমনা হেঁটে যেতে যেতে লেবুপাতার গন্ধে প্রখর হয়ে ওঠে আমার পর্যবেক্ষণ, আমার অস্তিত্ব…আমার অপরাধ…আমার অনুশোচনা সম্পর্কে বৃদ্ধ, গাভী কিংবা চড়ূই ছানা—কেউ কি সচেতন?
ছয়.
এসে দাঁড়াই প্রিয় প্রতিবেশীর লগকেবিন সংলগ্ন আঙিনার প্রান্তিকে। জাদুকরীর দক্ষতায় পথঘাট দিব্যি চিনে-চিন্তে হেঁটে যায় দৃষ্টি-রহিত নারী, সাদা লাঠির প্রান্ত ঝরা পত্রালি বিঁধে বিঁধে নীরবে বৃত্ত যায় এঁকে, কেয়ারি করা পাথরে সামান্য ঠোকর খেয়ে কার্নিশের তলা থেকে তুমি তুলে নাও ঝারি। সরে যায় মেঘের চাকলা—আর ভেসে ওঠে অপরাহ্ণে জলরঙে আঁকা চাঁদ, ঝোপঝাড়ে ডানা ঘষে জোড়া ঝিঁঝিঁ পোকা, আমার করোটিতে ফিরে আসে অনাহুত দৃষ্টিপাতের অপরাধ, গার্ডেনিয়ার বুনো ঝোপে ফুটেছে শুভ্র প্রসূন থোকা থোকা, উড়ে এসেছে হামিং বার্ড—জগৎ সংসারের সদা চঞ্চল পাখি, ছড়াচ্ছে মৃদু গন্ধ, সৌরভের সতেজ মহিমা তুমি পাও কি?
ছয়.
নিজের ছায়াটি নিশানা করে যেন রুকু সেজদায় উবু হও, শেকড়সহ উপড়ে নিয়ে অনভিপ্রেত আগাছা—সজোরে ফেল দীর্ঘশ্বাস, বাতেনির মেঘাচ্ছন্ন গুহা থেকে চাঁদটি ফের হয় জাহির, দোলে ঝুলন্ত পত্রালি, ভেসে আসে সমুদ্রের সুবাতাস, ঝিঁঝি পোকাগুলো এ অপরাহ্ণেও হয়েছে অধীর। আমার অনুপ্রেরণা দূর্বাশিশিরে হয়ে ওঠে দ্বিধাবিভক্ত অব্যয়, ভাবি— কেন আমি অনাত্মীয় আগাছাদের দেই বারবার প্রশ্রয়?
সাত.
উত্তুরে হওয়ায় গ্লাইড করে দুটি গঙ্গাফড়িং কাছে আসে, মিহি মসলিনে তৈরি ডানায় জড়িয়ে যায় গোধূলি, জোড়ে সরে যায় সামান্য দূরে—যেখানে দাঁড়িয়ে আছো তুমি চুল-খুলি, শ্বেতশুভ্র যষ্ঠিতে স্পর্শ করে দূর্বাদাম হাঁটো ফের, ধূসর বোল্ডালে ঠোকর খায় স্যান্ডেল, লাঠির ডগায় স্পর্শ করো টবে চন্দ্রমল্লিকার গোড়ালি, অনুভব করো… চারাটির প্রয়োজন কী জলের, ভাবি—শুভ এ সান্ধ্যা-লগ্ন, আজ হয়তো হবে না ‘সকলি গরল ভেল’!
আট
আসন্ন সন্ধ্যার গাঢ় ম্লানিমায় বিষন্ন হয়ে ওঠে তোমার কোমরে জড়িয়ে পরা বিবর্ণ সানড্রেস, মৃদু হাওয়ায ভেসে আসে সাইট্রাসের সুগন্ধ, তাবৎ কিছু হয়ে ওঠে সতেজ …রিফ্রেস, উবু হতেই খুলে যায় টপ এর অন্যমনষ্ক বোতাম, লাঠির ঘায়ে জড়ো হয়ে ভাঁপা পিটার মতো স্ফীত হয় ঝরাপাতা, অবচেতনের এঁদো ডোবা থেকে ভুড়ভুড়ি হয়ে ভেসে ওঠে মন্ষ্কাম, স্ট্র্যাপ সরে গিয়ে প্রকাশিত হয় আইভরির আভায় অমসৃণ ত্বক, পাতা সরিয়ে কেন জানি তুলে নাও শ্যাওলায় সবুজ হয়ে ওঠা রক্।
নয়.
সিঁড়ি বেয়ে আলতো পায়ে তুমি উঠে যাও বারান্দায়। আঙিনার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ, দেয়ালে ঝুলন্ত আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে অর্কিড, আমার অবচেতনে সঙ্গোপন স্বত্ত্বা এক হয়ে ওঠে মৌমাছি-প্রবণ, আরশির সামনে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, মেঘচোঁয়া রোদে ঝলছে ওঠে ঝুমকোপাশায় গ্লাসবিড, দেখতে তো পাও না— তবে কী এ মুহূর্তে অনুভব করছো তোমার একহারা অবয়ব, কোন যাদুবলে শুনতে পাও কী অনাহুত এক আনন্তুকের নীরব স্তব? দরোজার পাল্লা ঠেলে ঢুকে পড়ো কামরায়, স্বচ্ছ শার্সি অতিক্রম করে দেখতে পাই দেহের প্রোফাইল, কিন্তু কাঁচের আড়ালে সুষ্পষ্ট হয় না অননের বলিরেখা, সূর্যাস্তের আভায় রঙিন হয়ে ওঠে বারান্দার টাইল, ভাবি, অতিক্রান্ত অপরাহ্ণে ফের পাবো কী দেখা?
দশ.
ঝোপঝাড় হয়নি ছাটা, পুষ্পিত পরিজাত লাতিয়ে হচ্ছে বুনো, কেয়ারি করা বাগিচাটির বহুদিন নেয়া হয় না যত্ন, প্রতিদিন পাই না সাক্ষাৎ—মনে হয় চরিত্রে তুমি ঘরকুনো, খননের চিহ্ণ দেখে ভাবি— কেউ এখানে তালাশ করেছে খনিজ রত্ন। বোধ করি এক যুগে বেরোতে জয়-রাইডে— রোদেজলে বিবর্ণ এ হুডখোলা মোটর কারে, হানিজারে পড়ে যাওয়া মৌমাছির মতো আটকে পড়েছে আমার মন, যন্ত্রযানটি ঝুরঝুরে হয়ে ওঠেছে মরচে-বহুল ক্ষারে, এভাবে কাটালে আরো কিছু দিন, সমুদের নোনা হওয়ায় বর্ধিষ্ণু গুল্মলতা জড়িয়ে বাগিচা যে হয়ে ওঠবে বাদাবন!
এগারো.
মনে হয় দোলনাটি বছর দশেক আগে ছিড়ে পড়ে সেঁধিয়ে আছে মৃত্তিকায়, শিরিষের ডাল থেকে ঝুলছে দড়িকাছি, ফোয়ারাও ছেয়ে গেছে মসের সবুজাভ শৈবালে, একাকী দাঁড়িয়ে মনের নিবিড়ে জমে ওঠে ফেন্টাসি, কয়েকটি বনঘুঘু ঘাসবীজ খুঁটে খায় বেখেয়ালে, ফোয়ারার শিথানে দাঁড়িয়ে জননী মরিয়ম, কোলে তাঁর যিশু, মিমোসা তরুবরের তলায় পড়ে আছে বার্বি ডল, কাঁচের চোখে জমেছে নীলাভ শিশির, এ সংসারে একদিন ছিলো কী একটি শিশু, জানতে বিস্তারিত বাখানি খুঁজি ছল, অদূরের সমুদ্র থেকে উড়ে আসে নোনা সমীর।
বারো.
চন্দ্রকলার মতো ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায় আমার কৌতূহল, ভাবি—এ বেলা শিখে নিতে পারলে ব্রেইলের কৃৎকৌশল, পাঠানো যায় চিরকূটে নিমন্ত্রণ, চারটি ছানা নিয়ে বেরিয়ে আসে ম্যালার্ড হাঁস, দোলে ওঠে ঘাসবন, যদি-বা সাড়া দেয়, আসে আমার লগকেবিনে, বলবো না হয় আমিও তোমার মতো নিরিবিলি নিসর্গের ছাত্র, হাতে ধরিয়ে দিয়ে রাম ডেকোরির সুস্বাদু পাত্র, প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়—তরুণ নই হে— আমি ও নড়বড়ে পড়ো এক প্রবীণ, সংগীতে মতি থাকলে বলো, সংগ্রহে আছে বিটলসের রের্কড, চাইলে বাজাতে পারি, ‘উই অল লিভ ইন অ্যা ইয়োলো সাবমেরিন’,’ যাকে ভাবছো তুমি উপবনের মায়াবিভ্রম, দ্বিমত পোষি না, আমার কাছেও মনে হয় বৃথা সংযম, দিনযাপন তো আদতে বৃহৎ এক ধোকা, নেমে আসে সান্ধ্য তিমির, তোমার অঙিনায় জ্বলে ওঠে জুনিপোকা।
নোট: কবিতার শিরোনামে ও টেক্সটে ব্যবহৃত ‘উই অল লিভ ইন অ্যা ইয়োলো সাবমেরিন’’, পঙ্ক্তিটি চয়ণ করা হয়েছে—বিলেতের রক ব্যান্ড বিটলস্-এর একটি লোকনন্দিত লিরিক থেকে।